প্রতি বছরের মতো এবারও কোটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মার শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে শুরু হচ্ছে পবিত্র হজ্বের

পবিত্র হজ্ব ২০২৫: ইসলামের অনন্য মহাসম্মেলন ও বিশ্ব মুসলিমের আত্মশুদ্ধির সফর

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৪ জুন ২০২৫, দুপুর ৪:১২ সময় , আপডেট সময় : ৪ জুন ২০২৫, দুপুর ৪:১২ সময়

প্রতি বছরের মতো এবারও কোটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মার শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে শুরু হচ্ছে পবিত্র হজ্বের সফর। হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। প্রতিবছর যিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

চলতি বছরে ২০২৫ সালের হজ অনুষ্ঠিত হবে ৬ জুন থেকে ১১ জুন (সম্ভাব্য)। সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এবারের হজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ লাখ মুসলিম অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


হজের তাৎপর্য

হজ হলো আত্মশুদ্ধির এক মহাপর্ব, যেখানে মুসলমানরা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এসে এক ছাতার নিচে দাঁড়ান। এখানে নেই জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ধন-সম্পদের পার্থক্য। সবাই এক রঙের কাপড়ে (ইহরাম) এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে একই নিয়মে ইবাদতে মগ্ন থাকেন।

হজ মুসলমানদের মধ্যে একতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও আত্মতৃপ্তির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। একইসাথে এটি গুনাহ মাফ করিয়ে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবেও পরিগণিত। হাদিসে এসেছে—"যে ব্যক্তি হজ করল এবং অশ্লীল কথা ও পাপ থেকে বিরত থাকল, সে যেন মায়ের গর্ভ থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মতো পাপমুক্ত হয়ে ফিরে আসে।" (বুখারি)


হজের বিভিন্ন ধাপ

হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় যিলহজ মাসের ৮ তারিখ, যাকে ‘ইয়াওমুত-তারওয়া’ বলা হয়। এদিন হজযাত্রীরা মিনায় যান। এরপর ৯ তারিখ আরাফাত ময়দানে অবস্থান করেন, যা হজের মূল রোকন। হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ওকুফে আরাফা’, অর্থাৎ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা।

১০ তারিখ মুসলমানরা মুজদালিফায় রাত যাপন শেষে জামারায় (শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ) রমি করেন, পশু কোরবানি দেন এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করেন। এরপর হজের অন্যতম অংশ ‘তাওয়াফে ইফাযা’ সম্পন্ন করেন।

১১ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত চলতে থাকে মিনায় অবস্থান, প্রতিদিন তিনটি জামারায় পাথর নিক্ষেপ, যার মাধ্যমে মানুষ প্রতীকীভাবে শয়তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।


হাজীদের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা

সৌদি সরকার হজকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। হজ যাত্রীদের জন্য উন্নত পরিবহন, চিকিৎসা সেবা, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মিনায় স্থাপিত বিশাল তাঁবুগুলো আগুন প্রতিরোধক এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। আরাফাত ময়দানে খুতবা প্রচারের জন্য শত শত ভাষায় অনুবাদ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে হাজিদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি, টিকাদান ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য আলাদা চিকিৎসা টিম নিয়োজিত থাকবে।


আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

হজ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক দিয়ে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম উদাহরণ। এবারে হাজিদের জন্য ই-হজ কার্ড, মোবাইল অ্যাপস, ট্র্যাকিং সিস্টেম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইত্যাদি চালু করা হয়েছে।

হজ অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে হাজিরা তাদের অবস্থান, বাসের সময়, রুট নির্দেশিকা, ভাষান্তর, মেডিকেল সহায়তা ও জরুরি যোগাযোগ করতে পারবেন।

এছাড়াও ড্রোন, সিসি ক্যামেরা ও সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে হজ চলাকালীন ভিড় ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।


নারীদের অংশগ্রহণে পরিবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের হজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সৌদি সরকার বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। ২০২১ সাল থেকে নারীরা ‘মাহরাম’ ছাড়া হজ পালন করতে পারছেন নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। এবছরও বিপুল সংখ্যক নারী মাহরাম ছাড়া হজে অংশ নিচ্ছেন।

নারীদের জন্য আলাদা বাস, আবাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে।


বাংলাদেশের প্রস্তুতি

বাংলাদেশ থেকে এ বছর সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট ১ লাখ ২৭ হাজার হাজি সৌদি আরবে গমন করছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশ হজ অফিস, হজ অ্যাপ ও হজ কল সেন্টার চালু রয়েছে, যাতে হাজিরা যে কোনো সহযোগিতা পেতে পারেন।

বাংলাদেশি হাজিদের জন্য মিনায় পৃথক তাঁবু, নিজস্ব খাবারের ব্যবস্থা এবং বাংলা ভাষায় গাইড বুকও প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও মেডিকেল টিম, হজ মিশন ও কনসুলার সার্ভিস রিয়াদ ও জেদ্দায় কাজ করছে।


হজের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম ঐক্য

হজ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। জাতিসংঘের ভাষায়, “হজ একটি বৈশ্বিক মানবিক সংযোগের উদাহরণ।”

একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে লাখ লাখ মানুষ আল্লাহর কাছে দোয়া করে, ক্ষমা চায় এবং নিজের জীবনের আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়।


হজের শিক্ষা

হজ মুসলমানকে ত্যাগ, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। হজের প্রতিটি ধাপে রয়েছে নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তার পরিবার—হযরত হাজেরা (আ.) ও ইসমাইল (আ.)—এর আত্মত্যাগ ও ঈমানের নিদর্শন।

  • ইহরাম শেখায় সমতা ও একতা।

  • আরাফা শেখায় আল্লাহর সামনে নিজেকে পেশ করা।

  • রমি শেখায় শয়তানকে প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা।

  • কোরবানি শেখায় আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগের মহিমা।


উপসংহার

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়, এটি একজন মুসলিমের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনার সুযোগ। দুনিয়ার মোহ ও ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে একজন মুসলমান যখন হজের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, তখন তার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ হয় ইবাদত।

হজের মাধ্যমে যদি একজন মানুষ নিজের জীবন ও চরিত্রকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চালিত করতে পারে, তবে সেটিই হবে তার জীবনের প্রকৃত সফলতা।

এ বছরের হজ উপলক্ষে আমরা প্রার্থনা করি—আল্লাহ যেন সব হাজির হজ কবুল করেন এবং আমাদেরকেও ভবিষ্যতে হজ পালনের তাওফিক দান করেন। আমিন।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯